গরু পাচার মামলায় অভিযুক্ত তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের আইনি লড়াইয়ের বিপুল খরচ কে বহন করছেন? এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) সূত্রে দাবি, সে খরচ জোগাচ্ছেন বীরভূম জেলার নামজাদা ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল।
অনুব্রত 'ঘনিষ্ঠ' ওই টুলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, জেলায় পাথরের ব্যবসায় ভুয়ো চালানের মাধ্যমে দিনে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় করেন তিনি।সে অর্থেই কেষ্টর আদালতের খরচের জোগান দেওয়া হচ্ছে।
টুলুর পাশাপাশি সিউড়ি থানার আইসি শেখ মহম্মদ আলিও যুক্ত বলে দাবি জেলা সিপিএম নেতৃত্বের। তাঁদের আরও অভিযোগ, শাসকদলের নির্বাচনী খরচও জোগাচ্ছেন টুলুর মতো ব্যবসায়ীরা। যদিও এই অভিযোগকে 'মিথ্যা প্রচার' বলে নস্যাত্ করেছেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব।
ইডি সূত্রের দাবি, অনুব্রতর আইনি লড়াইয়ের জন্য কোটি কোটি টাকা কোথা থেকে আসছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা। সেই খোঁজে নেমে চঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন তাঁরা।
বীরভূমে দীর্ঘ দিন ধরেই পাথর চালানের অবৈধ ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ। আদালতের নির্দেশে হাতেগোনা কয়েকটি ক্রাশার খাদান ছাড়া বেশির ভাগই অবৈধ বলে দাবি। অভিযোগ, প্রশাসনের মদতেই জেলা থেকে প্রতি দিন হাজার হাজার পাথরবোঝাই গাড়ি বেরোচ্ছে।
এই পাথর বোঝাই গাড়ি থেকেই অবৈধ ভাবে চালান (ডিসিআর) কাটার কাজ করেন টুলু এবং তাঁর সংস্থা। ওই চালানের বেশির ভাগই ভুয়ো। অর্থাত্ সরকারি চালানের মতো দেখতে হলেও তা ভুয়ো চালান। ভুয়ো চালান দেখিয়েই অনায়াসেই জেলার সর্বত্র পাথরের গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে।
ইডি সূত্রের আরও দাবি, পাথরের ভুয়ো চালানের মাধ্যমে প্রতি দিন প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে টুলু এবং তাঁর সংস্থার। তার মধ্যে কিছু টাকা জমা পড়ে সরকারি খাতায়। এবং এই বেআইনি অর্থের থেকে অনুব্রত এবং তাঁর দেহরক্ষী সহগল হোসেনের আইনি লড়াইয়ের কোটি কোটি টাকার খরচ জোগান দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই সিউড়ি থানার আইসি শেখ মহম্মদ আলিকে টানা দু'দিন ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে ইডি। তাঁর বিরুদ্ধে এক দিকে যেমন গরু পাচার কাণ্ডে লিঙ্কম্যান হিসাবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে, অন্য দিকে তাঁর বিরুদ্ধে অনুব্রতকে কোটি কোটি টাকা জোগান দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ইডির সূত্রে খবর, অনুব্রতর গ্রেফতারির অনেকে আগেই টুলুর ব্যবসা নিয়ে তাঁকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সিবিআই এবং ইডি আধিকারিকেরা। এমনকি তাঁর বাড়িতেও অভিযান চালানো হয়েছে।
গোটা বিষয়টিই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার গোচরে আগে থেকেই আসা উচিত ছিল বলে মত জেলার বাম নেতৃত্বের। সেই সঙ্গে তাঁদের দাবি, শুধু অনুব্রতর মামলের আইনি খরচই নয়, পাথর চালানের অবৈধ ব্যবসা থেকে তোলাবাজির টাকাতেই শাসকদলের নির্বাচনী খরচও চলছে।
সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য সঞ্জীব বর্মণের দাবি, ''সিবিআই হোক বা ইডি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তো এগুলি বহু আগে জানা উচিত। আমরা জেনেছি, বগটুই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত সিবিআই গ্রহণের পর তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ছিল, লুটের টাকার বখরার কারণেই এই কাণ্ড হয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি লুট তো পাথরের গাড়ি থেকে হচ্ছে। একটা মহকুমায় প্রতি দিন আনুমানিক ৭ হাজার পাথরবোঝাই গাড়ি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা করে তোলাবাজি হচ্ছে। যাঁরা টোল গেট থেকে টাকা আদায় করছেন, তাঁদের জেরা করলেই তো সিবিআই বা ইডি সব জানতে পারবে।
অনুব্রতর ঘনিষ্ঠ টুলু মণ্ডল এবং তত্কালীন মহম্মদবাজার থানার ওসি বর্তমানে সিউড়ি থানার আইসি শেখ মহম্মদ আলি এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত। টুলু এবং আলিকে জেরা করলেই সব জানা যাবে। অনুব্রতর কোর্টের খরচ এই তোলাবাজির টাকায় হচ্ছে। এমনকি, তৃণমূল যেখানে ভোটে লড়েছে, তার খরচও উঠছে।''
সিপিএমের সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মিলটন রশিদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ''কেষ্ট'দার জন্য মামলায় বড় বড় আইনজীবীদের খরচ কে বা কারা দিয়েছে, তার তদন্ত করছে ইডি। শুধু কেষ্ট'দার ইশারায় এই দুর্নীতি হয়নি। ইডিকে তাদের অনুরোধ করব, ছোটখাটো চুনোপুঁটির দিকে না গিয়ে মাথা ধরুন।
তা হলেই সব সত্য বেরিয়ে আসবে।'' বীরভূমের দুবরাজপুরের বিজেপি বিধায়ক অনুপ সাহার সরাসরি অভিযোগ, ''টুলু এবং আইসি আলির মাধ্যমে অনুব্রতর কোর্টের খরচের টাকা যাচ্ছে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর টুলু এবং আলির মতো ব্যক্তিদের রমরমা বেড়েছে। অনুব্রতর মতোই আরও অনেক বড় বড় নেতা এতে জড়িত। ঠিকমতো তদন্ত হলে প্রত্যেকে শ্রীঘরে যাবেন।''
বিরোধীদের সমস্ত অভিযোগ নস্যাত্ করেছেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। জেলা তৃণমূলের সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ''সবটাই অভিযোগ। যে যেমন খুশি অভিযোগ করতে পারেন। যদি প্রয়োজন হয় আদালতে যাক, সেখানেই সমস্ত কিছুর বিচার হবে। আর বাকি মিথ্যা প্রচারে অত কান দেওয়ার কিছু নেই।''

No comments:
Post a Comment